Monday, 24 May 2021

#তুরস্ক টু #মদিনা রেলপথ যেভাবে ধ্বংস করেছিল! এক বেদনাদায়ক ইতিহাস... 💔

#তুরস্ক টু #মদিনা রেলপথ যেভাবে ধ্বংস করেছিল! 
এক বেদনাদায়ক ইতিহাস... 💔

যারা মদিনা যাবেন এই তুর্কি রেল ষ্টেশন দেখে আসবেন।মসজিদে নববী সাঃ থেকে হেটেই যাওয়া যায়।যদিও এখন মিউজিয়াম হিসাবে ব্যবহার হয়।অনেক দুর্লভ জিনিস আছে।

প্রথম রেলগাড়ি। যেটা দামেস্ক থেকে মদীনা মুনাওয়ারাহ-র উদ্দেশে ছেড়ে যাচ্ছে।

তুরস্কের সুলতানগন হজ যাত্রীদের সুবিধার্থে পবিত্র দুই নগরীর দেশ হেজাজকে সিরিয়ার সাথে রেল লাইনে সংযুক্ত করার পরিকল্পনা নেন। ১৯০০ সালে তুরস্কের সুলতান দ্বিতীয় আব্দুল হামিদ “হেজাজ রেলওয়ে” নামের এই মহা প্রকল্পটি শুরুর নির্দেশ দেন।

তৎকালীন সময়ে এটা ছিল অর্থনৈতিক এবং ইঞ্জিনিয়ারিং চ্যালেঞ্জ। এর বাজেট ছিল ১৬ মিলিয়ন ডলার।

কাজ শুরু হলো হেজাজ রেলওয়ে প্রতিষ্ঠার। দামেস্ক থেকে প্যালেষ্টাইন, জর্ডান হয়ে তাবুক দিয়ে হেজাজে প্রবেশ করে মদীনা হয়ে মক্কা পর্যন্ত সংযুক্ত হবে। ইস্তাম্বুলের হায়দ্রাপাশা ষ্টেশন থেকে দামেস্ক পুর্বেই রেলপথ ছিল। তুর্কি সুলতানগন প্যালেষ্টাইনে হাইফা বন্দর প্রতিষ্ঠা করেন উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে। হাইফা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান সরবরাহ বন্দর হিসাবে। হাইফাকে সযুক্ত করা হল হেজাজ রেলওয়ের সাথে দেরা জংশনে।

দামেস্ক থেকে মদিনার রেল লাইনের দৈর্ঘ ১৩২০কি.মি.। বাকী শাখা লাইন সহ হেজাজ রেলওয়ের মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ১৬০০ কি.মি.। কাজ শুরু হয় ১৯০০ সালে। এই প্রকল্পে ৫০০০ তুর্কি সৈনিক নিয়োজিত ছিল। জার্মান সহযোগিতায়, তুর্কি প্রকৌশলীরা অবিশ্বাস্য দক্ষতায় কাজটি সম্পন্ন করেন।

কাজ শেষ হয় ১৯০৮ সালে। ১৯০৮ সালে মদীনা ষ্টেশনের উদ্বোধনের পর হেজাজের সাথে আরব জগতের বাকী অংশের সাথে দ্রুত যোগাযোগের এক নূতন দিগন্ত উন্মোচিত হলো। মদীনা হয়ে উঠে বহির্বিশ্বের সাথে হেজাজের যোগাযোগের অন্যতম প্রবেশ দ্বার। পুর্বের দুই মাসের বদলে মাত্র চার দিনে দামেস্ক থেকে মদীনা পৌঁছতে পারতেন হজ্জ যাত্রীরা। তাছাড়া ভ্রমন অনেক আরামদায়ক হলো। উটের পৃষ্ঠে ভ্রমণ ব্যয় ছিল চল্লিশ পাউন্ড। আর ট্রেনে খরচ হতো মাত্র চার পাউন্ড। কিন্তু প্রথম প্রথম নানা বিড়ম্বনার সন্মুখীন হতে হয় রেলওয়েকে এবং যাত্রীদের। বেদুইনরা রেলে আক্রমন করতো। প্রথম বছর ত্রিশ হাজার যাত্রী পরিবহন করা হয় এবং পরবর্তী ছয় বছরের মাথায় বেড়ে দাঁড়ায় বছরে তিন লক্ষ। 

মক্কায় তুর্কি সুলতানের ও খেলাফতের প্রতিনিধি ছিলেন মক্কার শরীফ হোসাইন বিন আলী। ১৯১৪ সালে প্রথম মহাযুদ্ধ শুরু হয়। প্রথম মহাযুদ্ধে তুরস্ক অক্ষশক্তির পক্ষে ছিল। স্বভাবতই ইংরেজরা সর্বশক্তি দিয়ে চেষ্টা করে তুর্কী সাম্রাজ্য ফাটল ধরানোর। সফলও হয়। ইংরেজদের প্রলোভিত প্রস্তাবে সাড়া দেন শরীফ হোসাইন বিন আলী। তুর্কীদের পরাজিত করতে পারলে তিনি হবেন হেজাজের রাজা এবং তাঁর এক ছেলে হবে সিরীয়া ও ইরাকের রাজা, আর এক ছেলে হবে ট্রান্স জর্ডানের রাজা।

অনারব তুর্কি শাসন ও খেলাফত থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য, মিত্রবাহিনী বা ইংরেজ শক্তির আনুকুল্যে শুরু হয় বিখ্যাত আরব বিদ্রোহ। শরীফ হোসাইন বিন আলী বিদ্রোহের নেতৃত্ব দেন। বিশাল অটোমান তুর্কি সাম্রাজ্য শাসন করা সরাসরি সম্রাট বা খলিফার পক্ষে সম্ভব ছিলনা। সম্রাটের প্রতিনিধিরা বিভিন্ন অঞ্চল শাসন করতেন। তুর্কি শাসনে অসন্তুষ্ট ছিল আরবরা। এছাড়াও ভিন্ন ভাষা ও জাতিয়তা বিভাজনের অন্যতম কারন হয়ে দাঁড়ায়। ১৯১৬ সালের ১০ই জুন শরীফ হোসাইন বিন আলী বিদ্রোহ করেন তুর্কী অটোমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে। জুলাই মাসে শরীফ বিন আলী মক্কার পূর্ন নিয়ন্ত্রন নেন এবং নিজেকে হেজাজের রাজা ঘোষণা করেন।

এব মধ্যে হাজার হাজার আরব বেদুইন তার বাহিনীতে যোগদান করে। ইংরেজরা অস্ত্র সবরাহ করে। তাছাড়া তুর্কি বাহিনীর আরব যোদ্ধারা অনেকেই পক্ষ ত্যাগ করে শরীফের সাথে যোগ দেন। দ্রুতই আরব যোদ্ধার সংখ্যা বাড়তে থাকে।

মক্কায় নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠার পর হোসাইন বিন আলী মদীনা অবরোধ করেন। বিশাল বাহিনী নিয়ে শরীফের তিন ছেলে অক্টোবর ১৯১৬ সালে তিন দিক থেকে মদীনা আক্রমন করেন। ইতোমধ্যেই আব্দুল্লাহকে জর্ডান, ফয়সলকে ইরাকের রাজা এবং আলীকে হেজাজের যুবরাজ হিসাবে ঘোষণা করা হয়েছে।

আরবদের সৈন্য সংখ্যা নিয়ে কিছু তথ্য বিভ্রান্তি আছে। মদীনা আক্রমনে সর্বমোট আশি হাজার সৈন্য সন্মুখ যুদ্ধে অংশ নেয়। এছাড়া টি.ই. লরেন্স (বিখ্যাত লরেন্স অব এরাবিয়া) ও এডমন্ড এলেনবির নেতৃত্বে ব্রিটিশ বাহিনী ছিল পশ্চাদভাগে। কিন্তু মদিনাস্থিত স্বল্প সংখ্যক তুর্কি সেনাদের প্রবল প্রতিরোধের মুখে বিপুল ক্ষয় ক্ষতি নিয়ে আরব বাহিনী পিছু হটে। আরবরা মদীনার তিন দিক থেকে আক্রমন করেও সুবিধা করতে না পেরে মদীনা অবরোধ করেন। তখন মদীনায় আনুমানিক এগারো হাজার তুর্কি সৈনিক ছিল।

এখানে এক তুর্কি বীরের কথা উল্লেখ না করলেই নয়। তিনি হলেন মদীনা প্রতিরক্ষার দ্বায়িত্বে থাকা তুর্কি বাহিনীর জেনারেল ফারদিন পাশা। জেনারেল ফারদিনের বীরত্ব সাহস ও বুদ্ধিমত্বার কাছে আরব বা মিত্র বাহিনীর কোন অভিযানই ফলপ্রসু হয়নি। ফারদিন পাশা মরু সিংহ নামে খ্যাত ছিলেন।

মদীনা অবরোধ বজায় রেখে আরব ও মিত্রবাহিনী হেজাজের অন্যান্য স্থানে তুর্কিদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হলো। তারা তুর্কি সরবরাহ লাইন কেটে দিতে হেজাজ রেলওয়ের উপর সর্বাত্মক আক্রমন চালায়। আরবরা চেষ্টা করে রেল লাইন ধ্বংস করতে আর তুর্কিরা মরিয়া ছিল হেজাজ রেলওয়ে রক্ষা করতে। এই রেল লাইনের অস্তিত্বের উপর তাদের যুদ্ধের ভাগ্য অনেক খানিই নির্ভর করছিল। হেজাজে তুর্কী বাহিনীর রসদ সরবরাহ পথ বন্ধ এবং সাম্রাজ্যের অন্যান্য অংশের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার জন্য রেল লাইন উৎপাটন করে ফেলা হয় এবং আগুন ধরিয়ে ধংস করা হয়। এর মাঝেও জেনারেল ফারদিন রেল লাইন চালু রাখার চেষ্টা করে যান। ১৯১৭ সালে ব্রিটিশরা প্যালেষ্টাইন ও ট্রান্স জর্ডান দখল করে। এবং হেজাজ রেলওয়ে বন্ধ করে দেয়। তুর্কি বাহিনী রসদ ঘাটতির সন্মুখীন হয়। আরব বিদ্রোহের কারনে রেল লাইনটি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়।

কিন্তু মদীনা থেকে তুর্কিদের সরানো যায়নি বা আত্মসমর্পন করানো যায়নি। জেনারেল ফারদিন আত্মসমর্পন না করার বিষয়ে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিলেন। তিনি এও প্রতিজ্ঞা করেন যে তিনি রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কে ত্যাগ করে যাবেন না। তিনি মসজিদে নববীতে তার সৈনিক ও অফিসারদের সন্মুখে এ ঘোষণা দেন শেষ গুলি থাকা পর্যন্ত যুদ্ধ করার নির্দেশ দেন। দীর্ঘ দুই বৎসর আক্রমণ ও প্রতিরোধ চলতে থাকে।

অবশেষে দুই বৎসর পর ১৯১৮ সালের অক্টোবর মাসে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়। ৩০শে অক্টোবর ১৯১৮ সালে তুর্কি সুলতান আত্মসমর্পন চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। ধারনা করা হয় এবার ফারদিন পাশা আত্মসমর্পন করবেন। কিন্তু তিনি আত্মসমর্পন করলেন না। ইস্তাম্বুল থেকে তাঁর কর্তৃপক্ষ নির্দেশ দেন যুদ্ধ সমাপ্তির ও আত্মসমর্পনের। কিন্তু ফারদিন প্রতিরোধ বজায় রাখেন আরো বাহাত্তর দিন। অবশেষে ৯ই জানুয়ারী কিছু তুর্কি অফিসার তাঁকে বন্দী করে আব্দুল্লাহর কাছে সমর্পন করেন। এভাবেই সমাপ্তি ঘটে এক বীরের প্রতিরোধ।

৫১৯ জন অফিসার ও ৭৫৪৫ জন তুর্কি সৈনিককে বন্দি করে মিসর পাঠানো হয়। জেনারেল ফারদিনকে পাঠানো হয় মাল্টায়। চার বছর বন্দি থাকার পর ফারদিন তুরস্কে প্রত্যাবর্তন করেন এবং কামাল আতাতুর্কের বাহিনীতে যোগ দেন।
১৯১৮ প্রথম মহাযুদ্ধের পর তুর্কি সাম্রাজ্যের আরব ভাষাভাষী অঞ্চলসমুহ সিরিয়া, ট্রান্স জর্ডান, ইরাক হেজাজ, নেজদ, লেবানন প্যালেষ্টাইন ইত্যাদি নামে স্বাধীন এবং ইংরেজ আশ্রিত রাজ্য ভাগ হয়ে যায়। ফলে আন্তর্দেশীয় রেল যোগাযোগ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। 

শতবর্ষ পূর্বে তৎকালীন সময়ের সর্বাধুনিক যোগাযোগ সুবিধা মদীনাবাসী এবং ভ্রমণকারীরা মাত্র আট বছর ভোগ করেছিলেন।

No comments:

Post a Comment