Saturday, 23 December 2023

নিট পোশাক রপ্তানিতে চীনকে টপকাল বাংলাদেশ।

 নিট পোশাক রপ্তানিতে চীনকে টপকাল বাংলাদেশ।



বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জে সত্ত্বেও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজারে নিট পোশাক রপ্তানিতে চীনকে পেছনে ফেলেছে বাংলাদেশ। প্রথমবারের মতো এই অর্জন করেছে দেশের পোশাক খাত। এর আগে ইউরোপের বাজারে ডেনিম রপ্তানিতে বাংলাদেশের আধিপত্য অর্জনের পরেই এই সাফল্য এলো।


ইউরোপীয় ইউনিয়নের আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যান দপ্তর ইউরোস্ট্যাট জানিয়েছে, ২০২৩ সালের প্রথম তিন প্রান্তিকে ২৭ দেশের এই ব্লকে বাংলাদেশের নিট পোশাকের রপ্তানিমূল্য ছিল ৮৩১ কোটি ইউরো।

একই সময়ে চীনের রপ্তানিমূল্য ছিল ৮২৭ কোটি ইউরো। তবে খুব কম ব্যবধানে এগিয়েছে বাংলাদেশ।

গত অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট পোশাক রপ্তানির ৫০ শতাংশের বেশি হয় ইউরোপীয় ইউনিয়নে। তখন পোশাকের মোট রপ্তানিমূল্য ছিল ৪৭ বিলিয়ন ডলার।


পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বাজারটিতে বাংলাদেশ ও চীন উভয় দেশের রপ্তানি কমেছে। গত বছরের তুলনায় বাংলাদেশের কমেছে ২০.৯৪ শতাংশ। শীর্ষ রপ্তানি আয়ের দেশ চীনের রপ্তানি কমেছে ২১.৫১ শতাংশ। তবে খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নে উচ্চ মূল্যস্ফীতি হওয়ার ফলে এই বাজারে চাহিদাও কমেছে।


ইউরোস্ট্যাটের তথ্যেও ইইউয়ের নিট পোশাক খাতের আমদানি চাহিদায় মন্দাভাবের চিত্র উঠে এসেছে, জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর সময়ে যা ১৭.৭১ শতাংশ বা তিন হাজার ১৯৪ কোটি ইউরোতে নেমে আসছে। আগের বছরের একই সময়ে চাহিদা ছিল তিন হাজার ৮৮২ কোটি ইউরোর।


ইউরোপীয় ইউনিয়নে পোশাক পণ্যের মন্থর চাহিদা অব্যাহত রয়েছে, যার ফলে এই অঞ্চলে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি বছরওয়ারি হিসাবে ১৭.৬৬ শতাংশ কমে মোট এক হাজার ৩৬৯ কোটি ইউরো হয়েছে। চীনের মোট রপ্তানিও একই সময়ে ২০.১৭ শতাংশ কমে এক হাজার ৭১২ কোটি ইউরো হয়েছে।


তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ সভাপতি ফারুক হাসান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘অব্যাহত চাহিদা মন্থর হলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের খুচরা বাজারে পোশাক বিক্রি বেড়ে যাওয়ার ইঙ্গিত পাচ্ছি আমরা, যা আমাদের জন্য সুবাতাস বয়ে আনছে।


যদিও চলতি বছরের অক্টোবর পর্যন্ত খুচরা বিক্রির ক্ষেত্রে আমাদের একরকম সংগ্রাম করতে হয়েছে, তবে আশার বিষয় হলো, যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল রিটেইল ফেডারেশন (এনআরএফ) চলতি বছরের বাকি অংশে ভোক্তাদের ব্যয় যথেষ্টভাবে বেড়ে যাওয়ার পূর্বাভাস দিয়েছে।’


তিনি বলেন, ‘এই সময়ে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় খুচরা বিক্রি ৩-৪ শতাংশ বাড়তে পারে। এনআরএফের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের খুচরা বিক্রি প্রাক-মহামারি সময়ের গড় মাত্রা ছাপিয়ে বৃদ্ধি পেতে পারে। এগুলো আমাদের জন্য, আমাদের পোশাকশিল্পের জন্য ইতিবাচক।’


বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, ‘চলমান বৈশ্বিক সংকটের মধ্যে চাহিদা ও রপ্তানি আদেশ কমছে। এখন ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ ক্রয়াদেশ নিয়ে কারখানা চালাতে হচ্ছে। এর পরও দাম কম, রপ্তানি কম, এর মধ্যে নিট পোশাক রপ্তানিতে শীর্ষ পোশাক রপ্তানিকারক দেশ চীনকে টপকে আজ বাংলাদেশ। এটা মন্দের ভালো। তবে আমরা ভালো নেই।’


ফজলে শামীম আরো বলেন, কম দামের পোশাক রপ্তানিতে চীনের আগ্রহ কম। তাই দেশটি থেকে ক্রেতারা তাদের সোর্সিং অন্য দেশে স্থানান্তর করছে। বাংলাদেশ এই ক্ষেত্রে ক্রেতাদের কাছে আস্থার বড় জায়গায়। এর ফলে দেশের রপ্তানি আয় বাড়ছে।  


এদিকে রপ্তানি আদেশ কমার পাশাপাশি তৈরি পোশাকের রপ্তানি কমেছে টানা গত দুই মাস। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরের তথ্য মতে, গত অক্টোবর মাসে তৈরি পোশাক রপ্তানি কমেছে ১৩.৯৩ শতাংশ, আর নভেম্বর মাসে কমেছে ৭.৪৫ শতাংশ।


- কালের কন্ঠ

সবুজ পোশাক কারখানার সংখ্যা ৭৬টি প্লাটিনাম রেটেডসহ ২০৬টিতে পৌঁছেছে।

 আগামী দশকের কৌশল হবে ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ, প্রযুক্তি ও জটিল দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগ: বিজিএমইএ পরিচালক


আগামী দশকের কৌশল হবে ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ, প্রযুক্তি ও জটিল দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগ: বিজিএমইএ পরিচালক


বিজিএমইএয়ের পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেছেন, বিশ্ব বাজারের অর্থনৈতিক মন্দা, ভূ-রাজনৈতিক সংকট, বৈশ্বিক বাণিজ্য নীতির পরিবর্তন, জলবায়ু কর্মকাণ্ড এবং ইএসজি অগ্রাধিকার এবং সরবরাহ চেইন বা ইনভেন্টরি ম্যানেজমেন্ট আগামী বছরে প্রধান সমস্যা হতে পারে।


ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেডের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক রুবেল বলেন, ‘আমাদের জন্য পরবর্তী দশকের কৌশলটি হবে পশ্চাৎপদ সংযোগ, প্রযুক্তি, জটিল দক্ষতা উন্নয়ন এবং টেকসই গতিতে বিনিয়োগ করা।’


তিনি বলেন, সবুজ রূপান্তরের উদ্যোগকে ত্বরান্বিত ও সমর্থন করতে হবে।


রুবেল তার ‘বিয়োন্ড চ্যালেঞ্জেস: কম্প্রেহেনসিভ রিক্যাপ অব বাংলাদেশ রেডি-মেড গার্মেন্ট ইন্ডাস্ট্রি ইন ২০২৩’-শীর্ষক নিবন্ধে লিখেছেন, ‘বৈশ্বিক হওয়া আমাদের পরবর্তী এজেন্ডা, যেখানে ভার্চুয়াল মার্কেটপ্লেস একটি কৌশলগত উপায় হিসেবে কাজ করতে পারে, বিশেষ করে এসএমইগুলোর জন্য।’


তিনি বলেন, ‘যেহেতু আমরা ২০২৪ সালে পদার্পণ করতে প্রস্তুত, একটি নতুন অধ্যায়ে শুরু করার জন্য প্রস্তুত; আমরা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলতে পারি ২০২৩ আমাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বছর ছিল। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক দ্বিগুণ চ্যালেঞ্জের সঙ্গে পাল্লা দেওয়া সত্ত্বেও আমরা সফলভাবে সেগুলো অতিক্রম করেছি এবং শক্তিশালীভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছি।’


রুবেল বলেন, ‘শুধু ২০২৪ সালে নয়, আগামী দশকেও আমাদের অর্জনের ধারা অব্যাহত রাখতে হবে।’


পণ্য, ফাইবার ও বাজারের বহুমুখীকরণ এবং মূল্য সংযোজনে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন এই সেক্টরের মূল সুযোগ।


রুবেল বলেন, ‘ব্যাকওয়ার্ড ও ফরোয়ার্ড লিংকেজ শিল্পে আমাদের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। একইসঙ্গে আমাদের উদ্ভাবন, প্রযুক্তিগত আপ-গ্রেডেশন, ডিজাইন ও দক্ষতা উন্নয়ন এবং সামগ্রিক ব্যবসায়িক সক্ষমতার প্রতি মনোনিবেশ করতে হবে।’


তৈরি পোশাক শিল্পের এই নেতা বলেন, অনিশ্চয়তা রয়েই গেছে, কারণ উন্নত অর্থনীতিগুলোও মুদ্রাস্ফীতি ও মন্দার সঙ্গে লড়াই করছে। সেইসঙ্গে মহামারির সংকট এখনও আমাদের অর্থনীতিকে তাড়িত করছে।


রাশিয়া-ইউক্রেন ও ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধের মতো ভূ-রাজনৈতিক সমস্যা প্রতিকূলতার একটি বাড়তি স্তর তৈরি করেছে।


মুদ্রাস্ফীতির বৃদ্ধি ২০২২ সালে ৮ দশমিক ৮ শতাংশসহ রেকর্ডের শীর্ষে পৌঁছেছে, ২০২১ সালে যা ছিল ৪ দশমিক ৪ দশমিক ৭ শতাংশ।


এর প্রভাবে ২০২৩ পর্যন্ত মুদ্রাস্ফীতি ৬ দশমিক ৮ শতাংশ অব্যাহত ছিল, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে পোশাকের জন্য ভোক্তাদের চাহিদাকেও প্রভাবিত করেছে।


২০২৩ সালের প্রথম ৯ মাসে ইউরোপীয় দেশগুলোর সামগ্রিক আমদানি ১২ দশমিক ০৮ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।


আরও পড়ুন: বাংলাদেশ থেকে আরও বেশি মূল্যের পোশাক কিনতে কেয়ারফোরের প্রতি বিজিএমইএ সভাপতির আহ্বান


অন্যদিকে, ২০২৩ সালের জানুয়ারি-অক্টোবরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ২২ দশমিক ৭১ শতাংশ আমদানি হ্রাস রেকর্ড করা হয়েছে।


ফলে বাংলাদেশও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) আমদানিতে ১৫ দশমিক ৮৭ শতাংশ এবং মার্কিন বাজারে ২৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ হ্রাসের সম্মুখীন হয়েছে।


তিনি বলেন, ‘এই চাপটি প্রধান পোশাক আইটেমগুলোর মূল্য নির্ধারণের গতিশীলতায় একটি উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলেছে, যার ফলে আমাদের গড় ইউনিটের দাম উল্লেখযোগ্য ৭-৯ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।’


বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প মূল্য সংযোজন পোশাক উৎপাদন শুরু করেছে, একটি কৌশলগত পদক্ষেপ যা আমাদের গড় ইউনিট মূল্য বজায় রাখার অনুমতি দিয়েছে।


একইভাবে, প্রতিকূলতার মধ্যে আমাদের সাফল্যের তালিকায় যোগ হয়েছে বেশ কিছু অর্জন।


ইউএসজিবিসির লিড প্রত্যয়িত সবুজ পোশাক কারখানার সংখ্যা ৭৬টি প্লাটিনাম রেটেডসহ ২০৬টিতে পৌঁছেছে।



অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও ২০২২ সালে ডব্লিউটিও’র ‘ওয়ার্ল্ড ট্রেড স্ট্যাটিস্টিক্যাল রিভিউ’ অনুসারে, বাংলাদেশ বিশ্ববাজারে ৭ দশমিক ৮৭ শতাংশ শেয়ারসহ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক হিসেবে র‌্যাংকিং পুনরুদ্ধার করেছে।


রুবেল বলেন, বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইইউর জন্য শীর্ষ ডেনিম-সোর্সিং দেশে পরিণত হয়েছে। এখন আমরা ইইউ বাজারে চীনের সবচেয়ে বড় পোশাক রপ্তানিকারকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ প্রতিযোগিতায় আছি।


আরএমজি সেক্টরের উন্নতি অব্যাহত রয়েছে, গত অর্থবছর ২০২২-২০২৩ সালে ৪৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে।


এটি আমাদের আরএমজি উৎপাদনের ইতিহাসে একটি নতুন অর্জন, কারণ ৪০ বছরের যাত্রায় আমরা ৪০ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করেছি।


প্রধান বাজার ইইউ ও যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও অপ্রচলিত বাজারে আমাদের রপ্তানি ২০০৮-০৯ অর্থবছরে ৬ দশমিক ৮৭ শতাংশ থেকে ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১৭ দশমিক ৮২ শতাংশ হয়েছে।


দেশের অভ্যন্তরে পদ্মাসেতু ও রেলওয়ে সেতু, মেট্রোরেল, ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, চট্টগ্রাম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, বঙ্গবন্ধু টানেল (কর্ণফুলী), ঢাকা-কক্সবাজার ট্রেন, পায়রা সমুদ্র বন্দরসহ অনেক অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে।


হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের টার্মিনাল-৩, মাতারবাড়ী তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং রামপাল কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের কথাও উল্লেখ করেন তিনি।


রুবেল বলেন, ‘বছরজুড়েই চ্যালেঞ্জ ছিল, কারণ আমরা বিদ্যুৎ ও গ্যাসের বর্ধিত দাম, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ হ্রাস এবং ন্যূনতম মজুরি পর্যালোচনা সংক্রান্ত সমস্যার সম্মুখীন হয়েছি।’


মার্কিন প্রকাশনা এবং ইউরোপীয় শ্রম নিয়ন্ত্রণের উপর বিশ্বব্যাপী মনোযোগ অতিরিক্ত চাপ তৈরি করেছে।


তিনি বলেন, ‘তবে আমরা জোর দিতে চাই এই ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখেও আমরা যেন শিল্পকে টেকসই করতে এবং আমাদের কর্মী ও সম্প্রদায়ের আরও ভালো যত্ন নেওয়ার জন্য সর্বাত্মক পদক্ষেপ নিতে পারি।’